ইবিতে ২০ লাখ টাকা শিক্ষক নিয়োগ-বাণিজ্যের অডিও ফাঁস

প্রকাশিতঃ 7:31 pm | July 15, 2018

ইবি প্রতিনিধি:

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) শিক্ষক নিয়োগে অবৈধ লেনদেনের একটি অডিও রেকর্ড ফাঁস হয়েছে। এই অডিওর কথোপকথন থেকে নিয়োগপ্রার্থীর সঙ্গে বাণিজ্যকারীদের ২০ লাখ টাকার চুক্তি হয় বলে তথ্য মেলে। কথোপকথনে ছিলেন বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. বাকী বিল্লাহ বিকুল আর ফারজানা নামের একজন নিয়োগপ্রার্থী যিনি নিয়োগ পেতে টাকাটা দেন।

তারা দুজনের কথোপকথনে নাম আসে ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহাদৎ হোসেন আজাদ আর ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর হোসেনের। বিশেষ করে এই নিয়োগ হওয়া-না হওয়ার ক্ষেত্রে ড. জাহাঙ্গীরের বড় ভমিকার কথা বারবার আসে।

ক্যাম্পাস ও অডিও সূত্রে জানা যায়, ১৪ জুলাই শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০টি বিভাগে ৩৭ জন শিক্ষক নিয়োগ ২৪১তম সিন্ডিকেট চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। কিন্তু নিয়োগ হয়নি ফারজানার।

পরে প্রার্থী নিয়োগ নিয়ে অডিও রেকর্ড ফাঁস হয়ে যায়। নিয়োগ প্রত্যাশী প্রার্থী ১০ লাখ টাকা নগদ এবং বাকি ১০ লাখ টাকার চেক দিয়েছেন। তবে ওই প্রার্থীর নিয়োগ নিশ্চিত না করতে পারায় টাকা ফেরত দেয়া হয়েছে। ১৩ জুলাই রাতে ওই প্রার্থীর স্বামীকে ফোনে ডেকে নিয়ে টাকা ফেরত দেয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।

এর আগেও ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকায় আর একটি নিয়োগ-বাণিজ্যের অডিও রেকর্ড গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। ওই অডিওতে ১২ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছিল। প্রার্থীর স্বামী শাহরিয়ার রাজ বলেন, ‘চাকরির ৯৯ শতাংশ কনফার্ম করেছিল বলেই টাকা দিয়েছিলাম। আমার স্ত্রীর আর চাকরির বয়স নেই। আমি তাদের বিচার চাই।’

তবে অডিও রেকর্ড কিংবা নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন নাম আসা তিন শিক্ষক। তারা বলছেন, এর পেছনে রাজনীতি ও ষড়যন্ত্র থাকতে পারে। তারা অবৈধ কোনো লেনদেনের সঙ্গে জড়িত নন।

অডিও রেকর্ডের কিছু অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:
ড. বাকী বিল্লাহ: এ মামুন ভাই আপনি আসতিছেন?
ফারজানা: আসসালামু আলাইকুম, স্যার।
ড. বাকী বিল্লাহ: হ্যাঁ, দেখ বাবু আমি…
ফারজানা: স্যার, আমি তো আপনাদের কথা শুনে অনেকখানি একদম ডিপেন্ডেবল যে কালকে… জাহাঙ্গীর স্যার যখন বলল, আপনাকে, আপনার মাধ্যমে টাকাটাও ডিল-ট্রিল করবে, আপনার কথা শুনে আমি একদম ২০ লাখ টাকাও হাতে ধরায় দিলাম। তুলে দিলাম। আশা করলাম। স্যার কেন এমনটা করল? জাহাঙ্গীর হোসেন স্যার।

ড. বাকী বিল্লাহ: এখন আমি তোমার স্যারের সাথে এতক্ষণ বসে থেকে কথা বললাম।
ফারজানা: স্যার তো সিগনেচার না করলে নিয়োগ হতো না। স্যার তো আমাকে বলতে পারত। আমাকে আরও অ্যামাউন্ট দেয়া লাগত। আমি তাতেও রাজি ছিলাম।

ড. বাকী বিল্লাহ: না না, ওসব না, ওসব না। মনি, ওসব কোনো কিছুই না।
ফারজানা: তাহলে কেন আপনারা আমাকে কনফার্ম দিলেন? আমি রিটেনে ভালো করলাম। ভাইভাতেও ভালো করলাম। আমাকে সব আশ্বস্ত করে দিলেন। আর এখন শেষ মুহূর্তে এসে এমন করলেন আপনারা আমার সাথে!
ড. বাকী বিল্লাহ: এখন কুষ্টিয়া থেকে তোমাকে বলি, হয়তো অন্য কারও হয়েছে বা, যা হোক আমি তো বলতে পারব না।

ফারজানা: কুষ্টিয়ার ক্যান্ডিডেট তো আমিই ছিলাম, স্যার।
ড. বাকী বিল্লাহ: হুমমম, আরে বাবা আরও ক্যান্ডিডেট আছে।
ফারজানা: নুসরাত ছিল। নুসরাতের কি হইছে?
ড. বাকী বিল্লাহ: সেটা বলতে পারছি না।
ফারজানা: স্যার, কাইন্ডলি, আপনারা যদি একটু দেখতেন…
ড. বাকী বিল্লাহ: আরে বাবু…না না, আমি তো জাহাঙ্গীর স্যারের সাথে এখনই উঠে এলাম। এখন এই জিনিসটা এখনই আবার। মামুন ভাই জিনিসটা বারবারই জানতে চাচ্ছে। আমি কিন্তু তাকে জানাচ্ছিলাম না। আমি তাকে পরে জানাব। কালকে সিন্ডিকেট হবে। সিন্ডিকেটের পরে জানাব। কিন্তু আগে জানিয়েই আমি আরও বিব্রত হলাম দেখছি।

ফারজানা: জি স্যার, আপনি আমাকে কনফার্ম করলেন। তোমার এইটটি পার্সেন্ট হয়ে গেছে। তোমার কোনো অসুবিধা নেই। এর জন্য আপনি যখন যে শর্ত দিয়েছেন, টাকা দেয়া বলেন, জাহাঙ্গীর স্যারের… কোনো সত্যতা যাচাইও করতে যায়নি। আপনাকে সঙ্গে সঙ্গে টাকাটা পে করে দিয়েছি। সব করে দিয়েছি স্যার।
ড. বাকী বিল্লাহ: সেটা নিয়ে তো আর সমস্যা নাই। আমরা তো কোনো মিস ইউজ করিনি। জাহাঙ্গীর স্যার তো এটা মিস ইউজ করেননি। তাই না? এখন সে না পারলে, আমি তো মাঝখানে থেকে মানুষের উপকার করে এখানে তো কোনো ইন্টারেস্ট নেই।
ফারজানা: জাহাঙ্গীর স্যার এটা করত না?
ড. বাকী বিল্লাহ: পারত কি না সেটা আমার জানা নেই। রাতে ব্যস্ত হয়ে গেছেন। সরি বলেছেন উনি। এখন কী করব বলো? কিছু করার নেই বাবু। মামুন ভাইকে, আমি তো বসে আছি। উনি আসলে আমি তো উনাকে পৌঁছে দিয়ে…
ফারজানা: আচ্ছা আপনি উনার (স্বামী) সাথে কথা বলেন।
ড. বাকী বিল্লাহ: হ্যাঁ।
(ও প্রান্তে পুরুষকণ্ঠ। হয়তো ফারজানার স্বামী)
ফারজানার স্বামী : হ্যালো…।

ড. বাকী বিল্লাহ: হ্যাঁ, মামুন ভাই ভয় পাচ্ছেন কেন? কুষ্টিয়ার ছেলে। আপনি আসেন। আমি তো আপনাকে নিজে পৌঁছে দেব। কী মুশকিল রে ভাই…মানুষের উপকার করতে গিয়ে আমি নিজেই তো একটা বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়েছি।

অডিও রেকর্ডে তাকে জড়ানোর ব্যাপারে বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. বাকী বিল্লাহ বিকুল বলেন, ‘এটা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। বিষয়টি নিয়ে আমি বিব্রত।’

অভিযুক্ত অধ্যাপক ড. শাহাদাৎ হোসেন আজাদ বলেন, ‘রাজনীতি করার কারণে বিভিন্ন লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে হয়। তবে আমি কারও জন্য কখনো ভিসি স্যারের কাছে সুপারিশ করিনি।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘এ রকম কিছু প্রমাণিত হলে আমি চাকরি ছেড়ে দেব। আমি জানি না ওই প্রার্থীর নিয়োগ হয়েছে কি না। তবে আমি এমন ধরনের কোনো বিষয়ে জড়িত নই।’

কোনো ধরনের নিয়োগ-বাণিজ্যের চুক্তি হয়ে থাকলে তা কার্যকর হোক বা না হোক সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রাশিদ আসকারী। তিনি বলেন, ‘অসৎ ও অশুভ চুক্তির কোনো অভিযোগ এলে আমরা অবশ্যই তদন্ত করে দেখব। আমি দুর্নীতির ব্যাপারে জিরো টলারেন্স জারি করেছি।